হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের জন্মস্থানের নাম সেরহিন্দ-যাহা পূর্ব পাঞ্জাবের ফতেহগড় তহসীলে অবস্থিত। এই অঞ্চল ছিল গভীর জংগলাকীর্ণ; বাঘ-সিংহের আবাসস্থল। হিন্দি ভাষায় 'সেহের' শব্দের অর্থ সিংহ এবং 'রিন্দ' অর্থ বন বা অরণ্য। সুতারাং সেহেররিন্দ অর্থ সিংহের আবাসারন্য বা বাসের অরণ্য। সেরহিন্দ শব্দটি হিন্দী "সেহেররিন্দ" শব্দের অপভ্রংশ বা পরিবর্তিত রূপ।
"মুজাদ্দেদে আজম" নামক পুস্তকে ঐতিহাসিক মাওলানা মুহাম্মদ হালিম সাহেব উল্লেখ করিয়াছেনঃ ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে একবার কয়েক জন রাজকর্মচারী সরকারী তহবিল লইয়া লাহোর হইতে দিল্লী আসিতেছিলেন। তাহাদের কাফেলায় একজন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বুজুর্গ ছিলেন। আসিবার পথে যখন সেই কাফেলা সেরহিন্দ নামক গভীর জংগলের নিকটে পৌঁছায়, তখন উক্ত বুজুর্গ তাহার দিব্যদৃষ্টিতে দেখিতে পান যে, অদূর ভবিষ্যতে ওই সেরহিন্দ জংগল একজন বিশিষ্ট অলি-আল্লাহর পদস্পর্শে ধন্য হইবে।
পরবর্তী সেই বুজুর্গ বিষয়টি ফিরোজশাহ তুঘলকের মোর্শেদ হযরত সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী ওরফে মখদুম জাহানিয়া (রঃ) ছাহেবের সাথে আলোচনা করেন। ইহা শনিবা মাত্র তিনি আনন্দিত হন এবং বাদশা ফিরোজ শাহকে জানান যে, হিজরী ৭৬০ সাল থেকে আমাদের তরিকায় ধারাবাহিক ভাবে এইরূপ অসিয়ত চলিয়া আসিতেছে যে, রাসূলে করিম (সাঃ)এর জামানায় এক হাজার বছর পর হিন্দুস্থানে একজন বিশিষ্ট মহাপুরুষের আবির্ভাব হইবে, যিনি তাঁহার যুগের ইমাম ও মুজাদ্দেদ হইবেন এবং তিনি বেলায়েত ও নবুয়তের নিগুঢ়তত্ত্বে অভিজ্ঞ হইবেন। বিগত ওলীগণের সমস্ত নেয়ামত তিনি হাসিল করিবেন। আজ সেরহিন্দ জঙ্গলে সেই মহান মুজাদ্দেদের বিকাশের ইংগিত পাওয়া গিয়াছে। কাজেই বিলম্ব না করিয়া উক্ত স্থান আবাদীর বন্দোবস্ত করা হোউক।
পীরের নির্দেশে বাদশাহ ফিরোজ শাহ সেহিন্দ আবাদের উদ্দেশ্যে তথায় প্রথমে একটি দুর্গ নির্মাণের আদেশ প্রদান পূর্বক উজির খাজা ফতেহ উল্লাহকে দায়িত্ব অর্পণ করেন। উজির ছাহেব সেইদিনই বেশ কয়েক হাজার লোকজনসহ সেখানে গমন করেন এবং একটা উঁচুস্থান বাছিয়া দূর্গ নির্মানের জন্য ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। তৎপর দ্রুত গতিতে কার্য শুরু করেন। কিন্তু সারাদিনে যেইটুকু কাজ করা হয় অর্থাৎ দুর্গের যেইটুকু নির্মাণ করা হয়, রাত্রিতে আপনা-আপনিই সেই অংশটুকু ধ্বংস হইয়া যায়, এমনি ভাবে দিনের কর্ম রাত্রেই শেষ হইয়া যায়। কারণ উৎঘাটনের চেষ্টা করা হইল, কিন্তু রহস্য কিছুই বুঝা গেল না। অতঃপর উজির ব্যাপারটি বাদশাহকে অবহিত করিলে বাদশাহ ঘটনাটি তদীয় পীর হযরত মখদুম (রঃ) ছাহেবকে জানান। হজরত মুখদূম (রঃ) ছাহেব স্বীয় খলিফা ও উজিরের ছোট ভাই শাহ রফীউদ্দীন (রঃ) কে এই দায়িত্ব সমাপনের ভার অর্পণ করিয়া তখনই রওনা হতে নির্দেশ দেন এবং উক্ত স্থানের কুতুবিয়াত ও বেলায়েতও শাহ্ রফিউদ্দিন (রঃ) কে দান করেন। হযরত শাহ রফীউদ্দীন (রঃ) ছাহেব ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে দেখিতে পান যে, কর্মচারীবৃন্দ জোর জবরদস্তিভাবে হযরত শাহ শরফ বুআলী কলন্দর (রঃ) কে বিনা মজুরিতে কাজ করাইতেছে। ইহাতে রাজ কর্মচারীদের উপর গোস্বা হইয়া হযরত শাহ শরফ বু-আলী কলন্দর (রঃ) ছাহেব স্বীয় আত্মিক শক্তির প্রভাবে দিনে প্রস্তুতকৃত দুর্গের অংশ রাত্রিকালে ভাঙ্গিয়া ফেলেন।
হযরত শাহ রফীউদ্দীন (রঃ) ছাহেব বু-আলী ছাহেবকে সনাক্ত করিয়া তাহার সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন হযরত কলন্দর (রঃ) বলেন, 'আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় আপনি এখানে আগমন করিয়াছেন। এখন দুর্গ নির্মাণ করিতে পারেন। আমি আপনাকে সুসংবাদ প্রদান করিতেছি যে, কয়েকশত বছর পরে এই স্থানে আপনার বংশধরদের মধ্যে একজন ওলীয়ে বরহক বা সত্য ওলীর জন্ম হইবে; যিনি বেলায়েতের এক গৌরবময় স্থান লাভ করিবেন।; অতঃপর উভয়েই একত্রে বিসমিল্লাহ বলিয়া নতুনভাবে দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এক দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরী করা সম্ভব হইলো।
পরবর্তীতে শহরটি আবাদ হয় এবং ১২ মাইল বিস্তৃত এক জাঁকজমকপূর্ণ শহরের রূপ লাভ করে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে এই শহরটি শিখ সম্প্রদায়ের দ্বারা লুন্ঠিত হয়। এখানে যে শাহী কেল্লা নির্মিত হয়,শেখ সম্প্রদায় তার কিছু অংশ ধ্বংস করিয়া সেখানে গুরুদুয়ারা প্রতিষ্ঠা করে। এখনও সেই গুরুদুয়ারা বর্তমান। প্রতিবছর তাহার আশেপাশে বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
এতক্ষণ সেরহিন্দ শহরের পরিচয়ের কিছুটা তুলে ধরা হইলো। এই সেরহিন্দ শহরটি যে মহাপুরুষের পদধূলিতে ধন্য, সেই মহান সাধক হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের শুভ আগমন উপলক্ষে আরও যে সকল সাধক ভবিষ্যৎবাণী করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে গাউসপাক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) ছাহেব ও হযরত শায়খ আহমদ জাম (রঃ) ছাহেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য।
